‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব ১৬
____________________________
[ মানুষজন! পরবর্তী পর্ব শনিবার রাতে পাবেন। রবিবার ভার্সিটিতে এক্সাম আছে আমার৷ একধ্যানে কোর্সের পড়া পড়তে হবে এই কদিন। আশা করি আপনারা কনসিডার করবেন বিষয়টা ]
ডেইজি এতক্ষণ চুপচাপ এই পারিবারিক তামাশা দেখছিল। সাহস পাচ্ছিল না মাঝখানে কিছু বলার পাছে কোনো কটুক্তি শুনতে হয়! সেধে অপমানিত হতে কে ই বা চায়! ইমান যে মার খেলো সেটা নিয়েও তার বিশেষ মাথাব্যথা নেই। বরং রাগ বিরক্তি বাড়ছিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। ইডিয়ট টা ত বলেছিল একেবারে সলিড প্ল্যান বানিয়েছে! ফ্লপ হওয়ার চান্স ই নেই!
মাই গড! এটা সলিড প্ল্যানের নমুনা!
ডেইজির নিজের উপরও রাগ হলো কিছুটা। বিদেশে তাকে এপ্রোচ করা ওয়েল এস্টাবলিশড যুবকদের অভাব ছিল না৷ কেন যে আবেগের বশে পেটের বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে রেখে ইডিয়ট টার জন্য দেশে ফিরল! ভুল হয়েছে তার৷ এখন মহা ভুল হবে যদি মাথামোটা টার জেদের জন্য হিউজ ব্যাংক ব্যালেন্স প্লট এসবও হারিয়ে ফেলে! এমন লোভনীয় প্রোপার্টি হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয় থেকে এতক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ডেইজি দ্রুত পা চালিয়ে ইমানের গা ঘেঁষে দাঁড়াল।
বাহু জাপটে ধরে তাকে নিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘যথেষ্ট অপমান হয়েছে তোমার। আই ক্যান্ট টলারেট দ্যাট এনিমোর! এক সেকেন্ড ও এখানে আর থাকব না আমরা৷’
পরক্ষনেই গলা একেবারে খাদে নামিয়ে নামমাত্র ঠোঁট নেড়ে ফিসফিস করে বলল, ‘বাড়ি ত হাতছাড়া হয়েছে ই। এখন প্রপার্টিও হাত থেকে বেরিয়ে যাবে৷ তাই চুপচাপ চলে এসো৷ আর কথা বাড়াবে না, প্লিজ!
ইমান আযহার ভুইঁয়া বেকুব নয়। পরিস্থিতি যে তার নাগালের একদম বাইরে সেটা সে ভালোই বুঝেছে৷ তাই মনে একদলা রাগ পুষে রাখলেও বাইরে চেহারাটা বিধ্বস্ত দুঃখী বানিয়ে একপলক সবার দিকে চাইল। যেতে যেতেও এমন দুখী হবার নাটক করে একটা মেলোড্রামা তৈরি করতে সক্ষমও হলো সে। রেহনুমা ভুইঁয়া তখন বিলাপ করে কাঁদতে কাঁদতে সোফায় বসে পড়েছেন৷ আরমান ভুঁইয়া ততক্ষণে ফিরে গেছেন নিজের রুমে। হয়ত তিনিও পুত্রশোকে কাতর।
ছেলে দরজার বাইরে বেরিয়ে যেতেই রেহনুমা ভুইঁয়ার জমে রাখা সমস্ত রাগ ক্ষোভ দুঃখ একসাথে বেরিয়ে এলো। তিনি বসা থেকে দাঁড়িয়ে কারো তোয়াক্কা না করেই সমস্ত রাগ উগড়ে দিলেন নাজিয়ার উপর। বড়টাকে ছুট দিলেও তিনি শেষের বাচ্চা দুটোকে বড় করেছেন কঠিন অনুশাসনে৷ তাহলে আজ আযানের এত সাহস কোত্থেকে আসল বড় ভাইয়ের গায়ে হাত তোলার। তিনি ত এরকম শিক্ষা দেননি৷ নিশ্চয়ই বউ টাই মাথা চিবিয়ে খেয়েছে ছেলের।
বিন্দুমাত্র চিন্তাভাবনা না করে তিনি নাজিয়াকে শুনালেন ভীষণ কড়া কিছু কথা, করলেন একতরফা দোষারোপ।
‘শান্তি পেয়েছ তুমি? আমার সংসারে অশান্তি করে! আমার এক ছেলে বাড়িছাড়া আর আরেক ছেলে বড়ভাইয়ের গায়ে হাত তুলেছে শুধু তোমার জন্য! আর কি চাও তুমি। কেনো আমার ছেলের ঘাড়েই তুমি উঠে পড়লে! একজনের সাথে বিয়ে ভাঙার পর আবার আরেকজনের নামে কবুল পড়তে লজ্জা লাগেনি তো…..’
মহিলা কথা শেষ করতে পারলেন না ছেলের গমগমে ভরাট গলার আওয়াজ কানে আসায়। দেখলেন ছেলে কেমন রক্তচক্ষু মেলে একহাত তুলে আঙুল উচিয়েঁ তাকে থামাল কথার মাঝখানে। এত অধঃপতন হয়েছে ছেলেটার!
‘আম্মুুউউ!
আর একটাও শব্দও তুমি উচ্চারণ করবে না ওর ব্যাপারে! আমি কিন্তু এলাউ করব না সেটা।’
আযান ঠোঁট ভিজিয়ে বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে কথাগুলো বলল মাকে৷ তারপর মুখ ফিরিয়ে নিতেই দেখল বেকুবটা সটান দাড়িয়েঁ আছে। ঠোঁট চেপে কান্না থামানোর প্রাণপণ চেষ্টায় ব্যস্ত৷ তবুও দু ফোঁটা চোখের জল তার গড়িয়ে পড়ল আপনাআপনি। বড় বড় চোখের মণি দুটো বিষণ্নতায় ঠাসা! আযানের মনে হলো তার নিজের চোখও জলে ভরে আসবে।বেকুব টা কাঁদলে এত কষ্ট হয় আযানের! এত বেশিইই! সেটা ত তার নিজেরও জানা ছিল না এতদিন।
মহিলার বিশ্রী তিক্ত সব কথাবার্তা শুনে নাজিয়ার মন হুহু করে উঠছিল৷ মেয়েটা বহু চেষ্টা করল কান্না আটকানোর। মহিলা যদি আবার ভেবে বসে তার ছেলের মন নরম করতেই নাজিয়া এমন চোখের পানি ফেলছে। সেই খেয়াল থেকেই সে সবটা শুনে কষ্ট পেলেও শক্তমুখে সটান দাড়িয়েঁছিল৷ অথচ কথায় কথায় যার কান্নার অভ্যেস তার চোখের জল কখনো এমন অপমান মেনে নিবে! চোখের জল গড়িয়ে পড়ল অনায়াসে। সেটা সবার নজরে আসবে এমন ভাবনায় নাজিয়া দ্রুতপায়ে লিভিং রুম থেকে নিজের বেডরুমে ছুটল৷
আরমান ভুঁইয়া ছেলের এমন বাড়িছাড়ায় মর্মাহত ছিলেন৷ যেমনই হোক নিজের সন্তান, দুঃখ ত হবেই। তাই শোক কাটিয়ে উঠার চেষ্টায় নিশ্চুপ হয়ে নিজের রুমে গিয়ে বসে ছিলেন৷ কিন্তু গৃহিণীর এমন সব বিশ্রী কথাবার্তা শুনে তার শোকবোধ উবে গিয়ে রাগ এসে ভর করল৷ তিনি ত্রস্তপায়ে আবারও লিভিং রুমে এসে দাঁড়ালেন৷ দেখলেন মেয়েটার ছুটে যাওয়াটাও৷ মেজাজ মুহূর্তে চড়ে গেলো তার। বত্রিশ বছরের সংসার জীবনে তিনি স্ত্রীকে নিজের মনমর্জি মতন থাকার স্বাধীনতা দিয়েছেন। এমনকি কখনো ছেলেমেয়েদের সামনে কোনো বিষয়ে কথাও শুনান নি স্ত্রীকে। তবে আজ তার ধৈর্য্যর বাঁধ ভেঙে গেল। বড় ছেলেটা যে একমাত্র মায়ের আদর প্রশ্রয়েই ছোট থেকেই ধরাকে সরা জ্ঞান করেছে সেটাও তার অজানা না৷
তাই সমস্ত রাগ ক্ষোভ থেকে কোনো রাখঢাক ছাড়াই ছেলেমেয়ে দুটোর সামনেই তিনি স্ত্রী কে তীব্র ভর্ৎসনা করলেন।
‘তোমার এত সাহস হয় কি করে! যাকে আমি এই বাড়িতে সম্মানের সহিত মেয়ে বানিয়ে এনেছি তাকে অপমান করার!
মেয়েটাকে বলছিলে না, সে তোমার ছেলের ঘাড়ে উঠে বসেছে। তাহলে এটাও জেনে রাখো, রেজওয়ান চৌধুরীর মেয়ের জন্য যোগ্য পাত্রের অভাব ছিলো না কোনোকালেই! আমি আরমান ভুঁইয়া তার হাতে ধরে জোর করেছি বলেই সে তার একমাত্র মেয়েকে তোমার কুলাঙ্গার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে রাজি হয়েছিল৷
আমি আরমান ভুঁইয়া জোর গলায় বলেছিলাম দেখেই সে খোঁজখবর নেই নি তোমার আদরের চরিত্রহীন ছেলের ব্যাপারে।
আর তোমার আদরের ছেলেটার ই যখন নষ্টামি বের হয়েছে তখন আমি আরমান ভুঁইয়া ই আবারও হাত পেতেছি তার মেয়েকে আমার আরেক ছেলের বউ বানাতে৷ কারণ দোষটা আমার কুলাঙ্গার ছেলের তরফ থেকেই হয়েছে৷ তাদের মানম্মান হানি আমার কুলাঙ্গার ছেলের কারণেই হয়েছে।’
একনাগাড়ে এতগুলো কথা বলে দম ফেললেন তিনি। তারপর কঠিন গলায় যোগ করলেন,’‘কথা ক্লিয়ার এবার তোমার কাছে? আর কখনো যাতে না শুনি মেয়েটার ব্যাপারে তুমি এ ধরণের নিম্নমানের কথাবার্তা বলছ।’
আযান কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে মাকে দেখল৷ দেখতে চাইল মায়ের চোখেমুখে কোনো অপরাধবোধ আছে কিনা৷ সেটার লেশমাত্র খুঁজে পেল না বরং পেল নাজিয়ার প্রতি তীব্র রাগ ক্ষোভ বিতৃষ্ণা। সে বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে গুটিগুটি পায়ে নিজের রুমে পা বাড়াল৷ বেকুবটা হয়তো এতক্ষণে কেঁদেকেটে চোখমুখের অবস্থা বেহাল করে ফেলেছে! আযানের সামান্য ধমকে যে মুখ ফুলিয়ে থাকে এত কটু সব কথাবার্তা শুনে সে নিশ্চয়ই কান্নাকাটি করে মরছে৷ আযান ভেবে পেল না কি করে সে বেকুবের মাথা থেকে এসব কথাবার্তা বের করবে। তার নিজেরও ত ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকে পাওয়া এক একটা দুর্ব্যবহার এখনও মনে আছে!
নাজিয়া রুমের বাইরে আযানের পায়ের শব্দ পেতেই চটজলদি চোখমুখ মুছে একেবারে স্বাভাবিক হবার ভান ধরল৷ বদ টার ত কথাবার্তার ঠিক নেই৷ যদি বলে বসে এত কান্নাকাটির কি আছে। তোমার হয়ে আমি মাকে কথা শুনিয়েছি ত। তখন নাজিয়ার খুউব কষ্ট হবে। এতটা কষ্ট হবে যতটা রিনা খান মার্কা মহিলার কটু কথাগুলো শুনেও হয়নি। বদ টাকে ত নাজিয়া ভালবাসে৷ নাজিয়া কখনো পারবে বদ টার দেয়া কষ্ট সহ্য করতে! কক্ষণো না!
আযান মেয়েটার ফোলা চোখমুখ দেখে অবস্থা আন্দাজ করতে পারল৷ খুউব কেঁদেছে বোধহয়। এখন আযান কে দেখে মুখটা মিছিমিছি স্বাভাবিক বানিয়ে রেখেছে যেন খুউব স্ট্রং ড্যাম কেয়ার মেয়ে সে৷ বেকুব মেয়ে একটা! আযান কি তার চেহারা পড়তে পারে না নাকি!
আযান চেষ্টা করল নিজের কায়দায় বেকুবটাকে ভুলানোর। তাকে চমকে দিয়ে আগাগোড়া বিষয়টা আপাতত ভুলিয়ে দেয়ার। নাহয় মনে যতক্ষণ ঘটনা টার রেশ থাকবে বেকুবটা ততক্ষণ মুখ বেজার করে থাকবে, চুপিচুপি কাঁদবে।
সে হুট করে কিছু না বলেকয়ে বেডে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা মেয়েটার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল৷ নাজিয়া তখন নিজের দুঃখে কাহিল৷ হুট করে বদ টার এমন আচরণে চমকে উঠল। অপ্রস্তুতও হলো খানিকটা। বদ টা আগে কখনো এমন করে নি ত। আযান কোলে মাথাটা আরেকটু এলিয়ে দিয়ে খুউব ঝরঝরে গলায় ডাকল মেয়েটাকে, ‘অ্যাই বাঁদর! চুল টেনে দাও দেখি আমার৷ মাথা গরম হয়ে আছে একদম৷’
এরকম বলে চোখ বুজে ভাবল কি করে মেয়েটার মন ভালো করবে সে৷ ভেবে ভেবে মনস্থির করল এমনকিছু সে করবে যাতে সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। বাদঁরের মনখারাপও কমবে আর আযান যে বাদরঁ টাকে আদর করে সেটাও বাঁদর টার কাছে ধরা পড়বে না।
যতই বাদরঁ ভাবুক আযান তাকে কেবল চোটপাট ই দেখায় কিন্তু আযানের মন ত জানে আযান কতটা আদর করে বাঁদর টাকে। নাহয় বাঁদর টার কান্নায় আযানের এমন অহেতুক মনব্যথা হবে কেন!
এরকম অভিপ্রায়ে ই সে মিছিমিছি বিরক্ত হবার ভান করে বলে উঠল,
‘আহহা! চুল টেনে দিতে বললাম বলে একেবারে মাথার তালু সহ উঠিয়ে ফেলবে নাকি! শাশুড়ির রাগ তার ছেলের ওপরে বার করছ বোধহয়!’
থেমে গেল মেয়েটার আলতো হাতের চুল টানা। আযান বুঝল বাঁদর টা নিশ্চয়ই রাগ করেছে কথাটা শুনে৷ মুখ ফুলিয়ে রেখেছে এখন।
নাজিয়ার বড় অভিমান হলো৷ বদ টা বলতে পারল এমন কথা! শাশুড়ির উপর রাগ বের করতে হলে সে তক্ষুণি মহিলাকে কিছু কথা শুনিয়ে দিত নেহাৎ বয়সের ভদ্রতায় শুনায়নি। কিন্তু বরের উপর অহেতুক রাগ বের করবে তেমন অবুঝ বউ নাজিয়া মোটেও নই!
অভিমানে সে ঠেলেঠুলে বদটার মাথা কোল থেকে সরিয়ে একদম চুপটি করে বেডে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল৷ দেখল বদ টা কেমন কপাল ঘষতে ঘষতে উঠে বসেছে। ত্যক্ত রিরক্ত গলায় বলছে, ‘এভাবে একটুও মাথা ঠান্ডা হয়নি আমার। বাইরের ঠান্ডা বাতাসে একটু হেঁটে আসি। দেখি মাথা ঠান্ডা হয় কিনা’
কথাটা বলতে বলতেই আযান আড়চোখে দেখল মেয়েটাকে। বেকুবটা যে কেমন পাড়াবেড়ানি সেটা তার ভালোই জানা। তাকে বাইরে নিয়ে যেতে, তার মন ভালো করতেই ত এত আযানের এত কারবার!
তাই থেমে থেমে যোগ করল,’অ্যাই বেকুব! তুমি যাবে বাইরে? আবার মনে করো না তোমার মন ভালো করতে নিয়ে যাচ্ছি। অত ঠেকা পড়েনি আমার। নিয়ে যেতে চাচ্ছি এই চিন্তায় যদি আম্মু আবার এসে তোমার সাথে ঝামেলা শুরু করে! আব্বুর বড় বিরক্ত লাগবে সেসব।এমনিও হাই প্রেশার উনার।
ওভারঅল আব্বুর কথা ভেবে তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি। তাই জরিনা ক্যাটরিনা যা রেডি হবে দু মিনিটে হয়ে নাও।আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি ততক্ষণে’

