মেঘের মুলুকে চল’ আয়রা তাবাস্সুম পর্ব ২৪

0
3

‘মেঘের মুলুকে চল’
আয়রা তাবাস্সুম
পর্ব ২৪
_______________________________

সেই রাতে স্বামী স্ত্রী র স্বাভাবিক অন্তরঙ্গতা হলো দুজনের মধ্যে। পুরোটা রাত আযান ভীষণ যত্নে আদর করল তার বাঁদর টাকে৷ নাজিয়ার মনে হলো বিয়ের প্রথম রাতে এমন আদর কে সে ভয় কিভাবে পেয়েছিল! সব স্বামী রা ই বুঝি এতটা যত্ন করে আদর করে? বউয়ের খেয়াল রাখে এরকম শরীরি কামনার চরম মুহূর্তেও৷ পরক্ষণেই মেয়েটা বুঝল সবার বর রা এমন কখনো হতে পারবে না। সবাই কি আর আযান ইয়াসীর ভুইঁয়া! যে শেষ রাত অব্দি খেয়াল রেখেছে নাজিয়ার কষ্ট হচ্ছে কোথাও, অসুবিধা হচ্ছে কিনা। ভোর রাতে ঘুমে নিভুনিভু চোখেও নাজিয়া শুনেছে বদ টা কতশতবার আরমিইন বলে ডেকেছে তাকে, কষ্ট হচ্ছে কিনা জানতে চেয়েছে, চোখেমুখে অসংখ্য আদুরে চুমু দিয়েছে! এত চমৎকার বর নাজিয়ার! মানুষটা নাজিয়ার জীবনে না এলে কি যে হতো তার! ভাগ্যিস তার বিয়ের দিন অমন ঝামেলা টা হয়েছিল! নাহলে এই চমৎকার মানুষটাকে নাজিয়া কখনো পেতো!

নাজিয়ার ঘুম যখন ভাঙল তখন বেলা বারোটা গড়িয়েছে। বালিশ থেকে মাথা তুলবে তখন টের পেলো শরীরে টনটনে ব্যথা, এমন ব্যথা মেয়েটার অপরিচিত। কোনোমতে বেডের হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকাল। আযান কে দেখতে না পেয়ে স্বস্তির শ্বাস ফেলল মেয়েটা। কি একটা বিশ্রী অবস্থায় পড়ত সে যদি বদ টা আশেপাশে থাকত। বদ টা নিশ্চয় তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখত তাকে। তারপর আবার টিটকারিও মারত কাল রাতে তার কান্নার তোড়ে ভুলবশত বলে ফেলা কথাগুলো নিয়ে! সে পরনের পোশাক ঠিক করে কোনোমতে ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসল। তারপর বাসার অন্য রুমগুলোয় উঁকি দিয়ে খুঁজল আযানকে। বুঝতে পারল জনাব অফিসে৷ হয়তো নাজিয়ার ঘুৃম ভাঙতে চায়নি তাই বাইরে লক করে চলে গেছে৷

নাজিয়া নির্ভার হলো এবার। সারাদিন যথেষ্ট সময় পাবে সে নিজেকে প্রস্তুত করার। লোক টা টিটকারি মারলেও সেসবের মোক্ষম জবাব চিন্তা করে ঠোঁটের আগায় রাখার। যাতে বদ কিছু বললেই সেও তৎক্ষণাৎ মুখের উপ্রে জবাব দেবে। নাজিয়া নাহয় মুখ ফসকে বলে ফেলেছিল আদরের কথা তাই বলে বদ টারও সুযোগের ফায়দা তুলতে হবে! বজ্জাত একটা! নিজেই ত আদর করেছে তাহলে নাজিয়াকে আবার টিটকারি মারবে কেন! হুহ!

ডাইনিং রুমে আসতেই তার নজর পড়ল ডাইনিং টেবিলে রাখা হটপট টায়। খুলে দেখতে পেল তিন চারটা পরোটা রাখা আছে সেখানে। চোখ গেল পাশে থাকা স্টিকি নোট টায়৷ নাজিয়া পড়ল সেটা। বদ টা লিখেছে, ‘আরমিন! না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে না আবার! পরোটা রেখেছি হটপটে আর স্টোভে তরকারি আরেকটু গরম করে পরোটার সাথে খেয়ে নিবে। শরীরে ব্যথা থাকলে খাওয়া শেষে পেইনকিলার খাবে একটা৷ আরো কিছু প্রয়োজন হলে আমাকে যেনো মেসেজ করা হয়!’

নাজিয়া মিটিমিটি হাসল ছোট্ট আদুরে নোট টা পড়ে। শরীরের ব্যথাট্যথা ভুলে মেয়েটার মন নিমিষেই ভালো হয়ে গেল তখন। অথচ সে এতক্ষণ ভেবেছিল বদ টা তাকে টিটকারি করবে মজা নিবে তার অথচ তার সমস্ত ভাবনায় জল ঢেলে দিয়ে মানুষটা কিনা তাকে নিয়ে চিন্তা করেছে! সে কি খাবে তার সুবিধা অসুবিধা এসব নিয়ে ভেবেছে! আচ্ছা নাজিয়া কি কখনো বুঝতে পারবে মানুষটাকে! জানতে পারবে তার মনের মধ্যে কি চলে! যেরকম টা মানুষটা চট করে বুঝে নেয় নাজিয়ার মুখ দেখে!

গতকাল রাত পর্যন্ত তার মনে হয়েছিল মানুষটার কাছে সে একটা দায়িত্ব কেবল! অথচ নাজিয়া জানে দায়িত্বর সম্পর্ক তে স্রেফ ক্লান্তি থাকে, নিখাঁদ আন্তরিকতা থাকে না। তাহলে লোক টা প্রগাঢ় আন্তরিকতায় এত যত্ন এত যে খেয়াল রাখে তার সেটা নিশ্চয়ই কেবল দায়িত্ব থেকে করে না৷ নিশ্চয় তার মনেও নাজিয়ার জন্য কিছুমিছু আছে! এমন ভাবনা মাথায় আসতেই ফুরফুরে হয়ে এলো মেয়েটার মন। মনস্থির করল তাদের এই সম্পর্ক টায় সে নিজের তরফ থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করবে। এরপরে যা হবে হবে। বদ টা ভালোবাসুক না বাসুক অন্তত বাকিটা জীবন নাজিয়ার সাথে থাকলেই হলো। এমন চমৎকার মানুষ নাজিয়া আর দুটো পাবে!

আযান বাসায় ফিরল সন্ধ্যায়৷ এসেই তার প্রথম প্রশ্ন ছিল মেয়েটার শরীর ঠিক আছে কিনা, আর কোথাও অস্বস্তি কিংবা অসুবিধা লাগছে কিনা এটাসেটা। নাজিয়া এমন প্রশ্নের উত্তরে মুখ নামিয়ে মাথা নিচু করে রইল। লজ্জা লাগছে তার। আযান বুঝলো সেটা। বেকুব টা কাল রাতের ঘটনার জন্য লজ্জায় লাল হয়ে আছে। তবে আযানের মনে হয় যেটা হয়েছে সেটা ভালোর জন্যই হয়েছে।ভাগ্যিস মেয়েটা ভুলবশত বলে ফেললেও কথাগুলো বলেছিল নাহলে আযান তো তাকে কাছে টেনে নেয়ার সুযোগটাই পেতো না।

আযান জোরজবরদস্তি করার মানুষ না। সে সবসময় ভেবে এসেছে বেকুব যেদিন নিজে থেকে তাকে চাবে সেদিনই বেকুব আর তার মাঝে কিছু মিছু হবে। অন্তরঙ্গতার সময়টুকু যেহেতু দুজনের তাই কনসেন্ট ও দুইজনের তরফ থেকে থাকা উচিত এমন তার ধারণা। সেই ধারণার সুবাদে সে এতদিন অপেক্ষায় ছিল৷ মেয়েটা অভিযোগ জানাল গতকাল যে আযানের নাকি তাকে আদর করতে ইচ্ছে করে না এটাসেটা।

অথচ মেয়েটা যদি জানত তাকে মেরুন শাড়িতে প্রথমবার দেখে আযান কতবার যে বেক্কলের মতন তাকিয়েছে! মেয়েটার ফোলা ফোলা গাল দুটোতে আদর করতে গিয়েও কতশতবার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। কতশতবার মেয়েটার পাশ ফিরে ঘুমানোর তালে উঁচু হয়ে থাকা গলার বিউটিবোনে আদুরে চুমু খেতে গিয়ে নিজেকে সামলে নিয়েছে!
আযান ইয়াসীর ভুইঁয়ার প্রথমবার মনে হলো বাঁদর টা তার বহু অপেক্ষার, বহু সাধনার ফল!

______________________________________

রেজওয়ান চৌধুরী বাকহারা হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার এই ছেলে ছোট থেকে খুবই বুঝদার। কোন কিছু নিয়ে অনর্থক জেদ করে না। বলতে গেলে মেয়েটা তার খুব আদর আদরে বড় হলেও ছেলেটা সব সময় নিজেই সব সব পরিস্থিতি সামলেছে। ভীষণ বিচক্ষণতা এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে সবকিছু ডিল করেছে। ছেলের উপর এতদিন এই ভরসা ছিল রেজওয়ান চৌধুরীর যে সে ভাবনাচিন্তা না করে কোন কাজ করে না, অহেতুক কোন কথাবার্তা বলে না অথচ আজ ছেলেটার এমন কথা শুনে তিনি অবাক হতেও ভুলে বসলেন যেনো।

এই যেমন ছেলে আজ অফিস থেকে ফিরে লিভিং রুমে বসিয়ে মাথায় বাজ পড়ার মতো কথা বলেছে একটা।
‘আব্বু আমার একটা মেয়েকে পছন্দ আমি তাকে বিয়ে করতে চাই’
তার প্রথম কথাটা শুনে রেজওয়ান চৌধুরী এবং তার গৃহিণী দুজনেই খুশি হয়েছিলেন। যা মতি গতি ছেলের তারা ভেবে বসেছিলেন ছেলে হয়তো আজীবন কাজপাগলা ই থাকবে, বিয়ে-শাদী করবে না আর। আর ছেলেটাকে কোন মেয়ে ই বা পছন্দ করবে! যে ছেলে মেয়েদের থেকে শত হাত দূরত্বে থাকে, সহজে কথাবার্তা বলে না! মেয়েদের সাথে কথা বলা তো দূর ছেলে বাপ মা হিসেবে তাদের সাথেও কথা বলে মেপে মেপে, এমন অন্তর্মুখী গম্ভীর স্বভাবের ছেলে তাদের।

তাই প্রথমে ছেলের বিয়ে করার ব্যাপারে আগ্রহ শুনে রেজওয়ান চৌধুরী খুশি হয়েছেন যতক্ষণ না ছেলে পরবর্তী বাক্যটা বলে বসলো,
‘কিন্তু আব্বু মেয়েটার অন্য এক জায়গায় বিয়ে ঠিক হয়েছে। আগামী শুক্রবারে তার আকদ। হাতে এখনও তিনদিনের মতন সময় আছে। বিয়ে যেহেতু হয়নি এখনো আমি চাচ্ছি ওর বিয়েটা আমার সাথে হোক! তোমরা গিয়ে তার বাবা মার সাথে কথা বলবে, তাদেরকে বুঝিয়ে বলবে যে আমি তাদের মেয়েকে বিয়ে করতে আগ্রহী। আরো যা যা বলতে হবে আমি না হয় শিখিয়ে দেব।’

তারপরের কথাটা খুব সংকোচ নিয়ে বলল ছেলেটা। রেজওয়ান চৌধুরী ছেলের মুখে তখন স্পষ্ট অসহায়ত্ব দেখছিলেন অথচ এমন সচরাচর এমন নির্বিকার ঠান্ডা ধাঁচের ছেলে তার। ছেলেকে বলতে শুনলেন ‘আব্বুউ! আমি সহ্য করতে পারবো না সে অন্য কাউকে বিয়ে করলে। আমি ভালোবাসি তাকে।’

নাওয়ার চৌধুরীর তখন কপালে হাত। মনে হচ্ছে হুট করে ব্লাড প্রেশার বেড়ে গেছে তার। তিনি ধুম করে সোফায় বসে পড়লেন। একের পর এক ঝটকা তিনি যেন সামলে উঠতে পারছিলেন না। ভুতের মুখে রাম নামের মত প্রথমে ছেলের মুখে নিজে থেকে বলা বিয়ের কথা শুনলেন! তারপর শুনলেন ছেলে যাকে বিয়ে করতে চাচ্ছে তার নাকি আবার বিয়েও ঠিক হয়ে গেছে! মহিলার ভারী দুঃখ হলো। তার একটা ছেলে মেয়েরও বিয়ে কি একটু স্বাভাবিকভাবে হবে না! তিনি শুধু এটা ভাবলেন মেয়ের বিয়ে হয়েছে এক ঝামেলায় আর ছেলে বিয়ে করতে যাচ্ছে মহাঝামেলা মাথায় নিয়ে। কার না কার হবু বউ কে বিয়ে করে আনতে চাচ্ছে! তিনি কিছু ভাবতে পারলেন না আর। পুরো ব্যাপারটা তার স্বামী রেজওয়ান চৌধুরীর হাতে ছেড়ে দিলেন।

রেজওয়ান চৌধুরী ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছেন। তুখোড় অভিজ্ঞ বিজনেসম্যান তিনি। জীবনে বহু প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে তার। সেসবের তুলনায় এই ঘটনা তো নস্যি। তিনি গলা পরিষ্কার করে স্বাভাবিক বানিয়ে জড়তা নিয়ে প্রশ্নটা করলেন ছেলেকে। ছেলের সাথে এ ধরনের আলোচনা করতে অস্বস্তি হচ্ছিল তার। তবুও প্রশ্ন করলেন, মেয়েটা কে।
‘অথৈ!’
রাদ বাপকে একশব্দে জবাব দিল তাৎক্ষণিক। যেন সারাক্ষণ নামটা তার ঠোঁটের আগায় থাকে।

রাদ জানে মেয়েটাকে তার বাবাও ভীষণ স্নেহ করেন। তাই বাবার মতামত পেতে সমস্যা হবার কথা না। তখনো ছেলেটার মাথায় ঘুরছে অজস্র ভাবনা। কি বললে কেমন আচরণ করলে অথৈর বাবা মা পুনরায় বিবেচনা করবেন যার সাথে বিয়েটা হবার কথা তার সাথে বিয়েটা ভেঙে দিবেন, তারপর রাদের হাতে মেয়েটার হাত তুলে দিবেন।

রেজওয়ান চৌধুরী নামটা শুনে কিছুটা নির্ভর হলেন। প্রথমে ছেলের কথা শুনে মনে হচ্ছিল কোন না কোন মেয়ে ফাঁসিয়েছে তাকে যে ছেলে এতটা ডেস্পারেট হয়ে একটা বিয়ে ঠিক হওয়া মেয়েকে বিয়ে করতে চাচ্ছে! অথৈ র নাম শুনে তিনি কিছুটা স্বস্তি পেলেন। প্রথমবার ইন্টারভিউ বোর্ডে মেয়েটাকে দেখে তার ভীষণ সৎ মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল এই মেয়েটা দুনিয়ার এত জটিলতা বুঝেনা, খুব আনন্দ নিয়ে প্রতিটা দিন বাঁচে। এত ভেবে চিন্তে কথাও বলে না, সরল মন মেয়েটার। এটাও বুঝলেন তার স্বল্পভাষী মেপে মেপে দুনিয়াদারি বাচাঁ ছেলেটার জীবনে আনন্দের ফোয়ারা হিসেবে মেয়েটা আসতে পারে। অথৈ হয়ত পারবে ছেলেটার স্বভাবসুলভ গম্ভীরতা অন্তর্মুখী আচরণ থেকে তাকে বেরিয়ে নিয়ে আসতে। তিনি তখনই মনস্থির করলেন ভাবেই হোক মেয়েটার বাবা-মাকে বুঝিয়ে মেয়েটাকে বাড়ির বউ করবেন তিনি। ছেলেটা প্রথমবার মুখ ফুটে কিছু চেয়েছে তার কাছে। চাওয়াটা অন্যায় কিছু না। বিয়ে ঠিক হয়েছে কেবল হয়ে ত আর যায় নি। তিনি প্রাণপণে চেষ্টা করবেন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ছেলে যাকে পছন্দ করে ছেলের জন্য তাকে নিয়ে আসতে।

তিনি ছেলেকে ভরসা দিলেন তিনি সবটা সামলে নিবেন আর রাদের মাকেও বুঝাবেন ব্যাপারটা। রাদ বাবার এমন ভরসায় কিছুটা স্বস্তি পেল। যদিও যতক্ষণ মেয়েটা তার নামের সিলমোহরে আবদ্ধ হচ্ছে না ততক্ষণ তার স্বস্তি মেলা ভার। রেজওয়ান চৌধুরী এটাওটা বলে কোনোভাবে বোঝালেন তার ঘরণীকে। তাই মহিলাও সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলের খুশিতেই তার খুশি। ছেলেটা মুখ ফুটে কিছু বলে না সহজে, আবদার করে প্রথমবার কিছু চেয়েছে নিজের জন্য। তিনি মা হয়ে এমন আবদার কেনই বা ফেলবেন আর এছাড়াও তার স্বামী তাকে আশ্বস্ত করেছে মেয়েটা ভীষণ ভালো। এত জটিলতা বুঝেনা, সরল ভীষণ। এমন কথাবার্তা শুনে মেয়েটাকে না দেখেও তিনি মেয়েটার প্রতি ইতিমধ্যেই ভীষণ স্নেহ অনুভব করলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here