#চোরাবালির_পিছুটানে (০৫)
#জেরিন_আক্তার
রাহা লিখেছে,,
—-রাজ,
আমি রাহা বলছি। তুমি আমায় অস্বীকার করো আর যাই করো আমি এই বাচ্চাটা নষ্ট করতে চাইনা। প্রয়োজন পড়লে তোমার থেকে দূরে থাকবো। আমি আমার সন্তানকে একাই মানুষ করবো। আর তুমি আমায় হাজার খুঁজলেও পাবে না। আমি নিজ ইচ্ছে চলে গেলাম।
রাহা….
রাজ চিঠিটা পড়ে কেঁদে উঠলো। তার করা ভুলের জন্য রাহা নিজেই দূরে চলে গেলো। সে তো রাদিফকে বোঝাতে যেয়ে নিজের মূল্যবান জিনিসই হারিয়ে ফেললো। এর আফসোস এখন রাজকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে। নিজের প্রতি নিজেরই ঘৃণা হচ্ছে।
রাজ সারারাত ঘুমালো না। চিঠিটা নিয়েই বসে রইলো। শেষ রাতের দিকে ঝিমাতে ঝিমাতে ঘুমিয়ে পড়লো।
সকালবেলা রুবেল চৌধুরী আর রাশেদ চৌধুরী নাস্তা করতে বসেছেন ডাইনিং টেবিলে। পাশে দাড়িয়ে আছেন সায়মা চৌধুরী আর রুমানা চৌধুরী। কারোর মুখেই তেমন হাসি নেই। সবার মনটা খারাপ।
রাশেদ চৌধুরী খাবার খেতে খেতে সায়মা চৌধুরীকে বলেন,
“রাজ রাতে বাড়ি ফিরে কিছু বলেছে?”
সায়মা চৌধুরী গলার কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে বলেন,
“না। কিছু বলেনি।”
রুবেল চৌধুরী খাওয়া শেষ করে সোফায় গিয়ে বসলেন। ফোন বের করে পুলিশকে কল দিলেন। রাশেদ চৌধুরীও খাওয়া শেষ করে সোফায় গিয়ে রাশেদ চৌধুরীর পাশাপাশি বসলেন। এমন সময় রাজ নিচে নেমে এলো। রাজকে দেখা মাত্রই রাশেদ চৌধুরী বলেন,
“রাজ এখানে এসো!”
রাজ এগিয়ে আসতেই রুবেল চৌধুরী তপ্ত শ্বাস ফেলে উঠে চলে গেলেন। রাজ আর রাশেদ চৌধুরী ওনার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। ওনার মনে যে রাজের জন্য তীব্র রাগ বেড়েই চলছে এটা বুঝতে বাকি রইলো না সবার। রাশেদ চৌধুরী রাজকে পাশে বসতে বললেন। রাজ বসলো। সারারাত না ঘুমানোর কারণে চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। সাথে মাথা প্রচন্ড মাথা ব্যাথা।
রাজ চুপচাপ বসে আছে। রাশেদ চৌধুরীও কিছু বলছেন না। কিছুক্ষণ পরে তিনি নিজেই নীরবতা ভেঙে রাজকে বলেন,
“রাজ রাহার বিষয়টা কি রাদিফকে জানাবে?”
রাদিফের কথা শুনতেই রুমানা চৌধুরী এগিয়ে এলেন। রাজ নিচু গলায় বলে,
“হুম জানাও!”
রুমানা চৌধুরী ভয়ার্ত গলায় রুবেল চৌধুরীকে বলে উঠেন,
“ভাই, রাদিফকে জানালে পরিবেশ আদৌ কি ঠান্ডা থাকবে? যদি শোনে রাজ ওর জন্যই রাহার সাথে এমন করেছে তাহলে রাফিফ আমাকে, আপনাকে কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না।”
রাশেদ চৌধুরী বলেন,
“এই বলে ওকে জানাবো না! ও রাহার বড় ভাই, ওর অভিভাবকের মতো। ওকে জানানো প্রয়োজন। আর ভাবি ওকে জানালে ও যদি ওর কোনো খবর দিতে পারে। বন্ধু-বান্ধব দিয়েও তো খোঁজ করতে পারবে।”
রাশেদ চৌধুরী রাদিফকে কল দিলো। রাদিফ আজ নিজের বাড়িতেই রয়েছে। আজ আর অফিসে বা কোনো কাজেই বের হবে না। বোনের সাথেই থাকবে। রাদিফ ড্রইং রুমে বসে ফোন স্ক্রল করছিলো। ঠিক তখনই রাশেদ চৌধুরীর কল এলো। রাদিফ ইচ্ছে করেই প্রথম বার ধরলো না। তার কল ধরার বিন্দু মাত্র ইচ্ছে নেই। এরপরে আবার কল দিতেই কল ধরলো। রাশেদ চৌধুরী বলেন,
“রাদিফ কেমন আছো?”
“ভালো আছি, তুমি কেমন আছো?”
“ভালো।”
“বাড়ির সবাই কেমন আছে?”
“ভালো আছে। তুমি তো এই টাইমে অফিসে থাকো।এখন কি অফিসে রয়েছো?”
“না, আজ বাড়িতেই রয়েছি। অফিসে যাইনি!”
“রাদিফ তোমাকে একটা কথা বলতে চাই!”
“হ্যা বলো!”
রাশেদ চৌধুরী কি বলতে পারে রাদিফ তা জানে। রাশেদ চৌধুরী নিচু গলায় বলেন,
“রাদিফ রাহাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না!”
এই শুনে রাদিফ চমকালো না। সে এটাই আন্দাজ করেছিলো। কিছুটা প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলে,
“রাহাকে খুঁজে পাচ্ছো না মানে? কোথায় গিয়েছে ও?”
“কোথায় গিয়েছে কিচ্ছু বলে যায়নি। কালকে থেকে নিখোঁজ! নিজ ইচ্ছায় চলে গিয়েছে।”
“কালকে থেকে নিখোঁজ আর আজকে জানাচ্ছো আমাকে? আর ও নিজ ইচ্ছায় চলে গেলো তোমরা টের পাওনি?”
রাশেদ চৌধুরী বলেন,
“রাদিফ আমার পুরো কথাটা শোনো! রাহা আর রাজ দুজন-দুজনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো। আমাদের থেকে লুকিয়ে রেখেছিলো বিষয়টা। রাহা প্রেগন্যান্ট ছিলো। আর তখন রাজ রাহার সাথে পুরোনো কিছু কথা নিয়ে ঝামেলা করেছিলো। আর এরপরেই রাহা বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে।”
রাদিফ একটুও অবাক হলো না। সে তার চাচার মুখ থেকে পুরোনো ঝামেলার কথা শুনতে চায়। না শোনা পর্যন্ত তার শান্তি হচ্ছে না। তাই না জানার ভঙ্গিতে বলে উঠে,
“চাচ্চু কিসের পুরোনো ঝামেলা?”
রাশেদ চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিচু স্বরে বলেন,
“তোমার আর মিষ্টির মাঝে যে ঝামেলা হয়েছিলো সেটার প্রতিশোধ নিতেই রাজ রাহাকে কথা শুনিয়েছিলো।”
এই শুনে রাদিফ রাগে তেতে উঠে বলে,
“তোমার ছেলে প্রতিশোধ বোঝে? তোমার ছেলে কি হিসেবে আমার আর আমার বোনের থেকে প্রতিশোধ নিতে চায়। তুমি খুব ভালো করেই জানো আমিও কিন্তু তোমার থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতাম। বলো পারতাম কি না?”
রাশেদ চৌধুরীর মুখে কোনো কথা নেই। তিনি নিচু হয়ে বলেন,
“হুম। এখন আমি স্বীকার করছি আমার ছেলেরই সম্পূর্ণ দোষ। এখন আমাদের রাহাকে খোজা দরকার।”
এই শুনে রাদিফ উচ্চ গলায় বলে উঠে,
“চব্বিশ ঘন্টা সময় দিলাম তোমার ছেলেকে, তোমার ছেলে রাহাকে কোথায় থেকে খুঁজে আনবে আমি জানি না। এর মধ্যে যদি রাহার কোনো খোঁজ না দিতে পারে তাহলে ওকে রেডি থাকতে বলো। আমি তোমার ছেলের মুখোমুখি হবো। প্রতিশোধ নেওয়া ওকে শিখাবো। আর এর বিচারক হবে তুমি! ভালো হবে না!”
রাশেদ চৌধুরীর মুখে ভয়, সংকোচ ধরা পড়লো। নিজেই নত স্বীকার করে বলে উঠেন,
“রাদিফ আমাদের সময় দাও আমরা রাহাকে খুঁজছি!”
রাদিফ বাঁকা হেসে বলে উঠে,
“আর যদি না পাও তাহলে কিন্তু আমি আসবো!”
রাশেদ চৌধুরী অসম্মতি নিয়ে বলে উঠেন,
“না রাদিফ আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাবো। রাহাকে খুঁজবো।”
রাদিফ আগের ন্যায় বলে উঠে,
“ভয় পাচ্ছো যে! তবে ভয় নিয়েই থাকো। আর যদি রাহাকে না পাও তাহলে আমি ফিরবো। আমার ফিরতেই হবে। এখন তোমার ছেলের জন্য আমার বোন নিখোঁজ। এখন তো আমি আর চুপচাপ থাকবো না।এখন আমার দোষ হচ্ছে যে আমি মিষ্টিকে অস্বীকার করেছি বলে রাজও আমার বোনকে অস্বীকার করেছে। তুমি তো জানো, আমি নিজে থেকে মিষ্টিকে অস্বীকার করিনি। তাহলে আমি কেনো আমার বোনের বিষয়টা নিয়ে চুপচাপ থাকবো। ওকে যদি না পাও, তাহলে আমি ফিরবো, আর তুমি আমার সাথে কেমন চাল চেলেছিলে আমার তো সবটা সবাইকে জানাতে হবে।”
রাশেদ চৌধুরী কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেললেন। রাদিফের কথাগুলো শুনে মনে মনে ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি গলার কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে বলে উঠেন,
“রাদিফ আমরা রাহাকে খুঁজে পাবোই। তুমি চিন্তা করো না। আর রাহাকে পেলে জানাবো।”
রাদিফ তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে উঠে,
“হুম জানিও! আমি অপেক্ষায় থাকবো। তোমার ছেলের আর তোমার কাছে সময় কিন্তু চব্বিশ ঘন্টা।”
রাশেদ চৌধুরী বলেন,
“হুম রাদিফ, এর আগেই ওকে খুঁজে পাবো ইনশাআল্লাহ।”
রাদিফ আর কিছু বলার আগ্রহ দেখালো না। শেষ কথা হিসেবে শক্ত গলায় বলে উঠে,
“হুম। খোঁজো, আর না পেলে আমি কি করবো তা তোমার ভালো করেই জানা আছে।”
রাদিফ এই বলে কল কেটে দিয়ে ফোনটা টেবিলে রাখলো। পেছনে দাড়িয়ে আছে রাহা। রাদিফ রাহার উপস্থিতি অনেক আগেই টের পেয়েছে। রাদিফ পেছনে ফিরে হেসে বলে উঠে,
“আমার পাশে এসে বস!”
রাহা ভাইয়ের পাশে এসে বসলো। অনেকটা কৌতূহল নিয়ে রাদিফকে বলে উঠে,
“ভাইয়া তোমার সাথে কি বড় আব্বুর কোনো পুরোনো ঝামেলা আছে?”
রাদিফ ঠান্ডা গলায় বলে উঠে,
“তু্ই বুঝিস না! আমি কেনো বড় আব্বুকে চাচ্চু বলে ডাকি! ওনার প্রতি আমার আর আগের মতো কোনো রেসপেক্ট বা কোনো কথা বলার আগ্রহই নেই। আর না কোনোদিন হবে।”
রাহা প্রশ্ন করে,
“কেনো ভাইয়া? কি হয়েছিলো যার জন্য তুমি বড় আব্বুকে দেখতে পারো না।”
রাদিফ রাহার মাথায় হাত রেখে হেসে বলে উঠে,
“সব জানতে পারবি, শুধু একটু অপেক্ষা কর!”
রাহার মনে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও কোনো প্রশ্ন করলো না। তার ভাইকে সে বিশ্বাস করে, একটু যখন অপেক্ষা করতে বলেছে তাহলে অপেক্ষাই করবে।
রাদিফ মেইডকে হাই তুলে ডাক দিলো। মেইড সাথে সাথে তাদের সামনে এসে বলে,
“জি স্যার বলুন!”
রাদিফ রাহাকে দেখিয়ে বলে,
“ও সকাল থেকে কিচ্ছু খায়নি। ওর খাবার রেডি করো!”
“ওকে, স্যার!”
মেইডটি সাথে সাথে চলে গেলো। রাদিফ রাহাকে খাবার টেবিলে গিয়ে বসতে বলে। রাহা বাধ্য মেয়ের মতো গিয়ে বসে পড়লো।
এদিকে রাশেদ চৌধুরী রাদিফের সাথে কথা বলা শেষ করতেই রাজ বলে উঠে,
“বাবা রাদিফ কি বললো?”
রাশেদ চৌধুরী রাদিফের সাথে হওয়া কথাগুলো কিছুই রাজকে বললেন না। তিনি অস্থির ভঙ্গিতে উঠে দাড়িয়ে রাজকে বলে উঠেন,
“রাজ আমাদের রাহাকে খুঁজতে যেতে হবে।”
রুমানা চৌধুরী রাশেদ চৌধুরীকে বলেন,
“ভাই, রাদিফ কি রাগারাগি করেছে?”
রাশেদ চৌধুরী লম্বা শ্বাস ফেলে বলেন,
“বোনকে না পেলে তো ভাইয়ের রাগ উঠবেই। তবে আমাদের আর দেরি করা উচিত হবে না। রাহাকে দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে। আর রাজ তুমি আমার সাথে এসো। তোমার সাথে আলাদা করে কিছু কথা বলতে চাই।”
রাজ তার বাবার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভাবলো—বাবা কেনো এমন কথা ঘোরালো। রাদিফ যা যা বললো রাজ তা পাশে বসে কিছু হলেও শুনেছে। তাহলে তার বাবা সবার সামনে বলছে না কেনো? আর আলাদা করেই ডাকছে কেনো? এখন তার বাবার কাছেই সব কিছুর উত্তর। এখন তার বাবা সবার সামনে যখন এড়িয়ে যাচ্ছে তাহলে রাজের এই পুরো জিনিসটা জানতে তার বাবার সাথে আলাদা করেই কথা বলতে হবে।
_____________
এর একটু পরেই রাদিফের ফোনে আবার কল এলো। এবার স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলো সাইমনের কল। রাদিফ কল রিসিভ করে বলে,
“কিরে কেমন আছিস?”
“বন্ধু ভালো আছি। তু্ই কেমন আছিস?”
“ভালো।”
সাইমন বলে,
“তু্ই আজ অফিসে যাসনি?”
“না যাইনি। আজ রাহার সাথেই থাকবো। কালকে যাবো অফিসে।”
“ওহ। বন্ধু শোন!”
“হ্যা বল!”
“বন্ধু আমি কালকে ফিরে আসছি!”
রাদিফ খুশি হয়ে বলে,
“কিহ! কালকে আসছিস?”
“হুম। কালকের ফ্লাইটেই।”
“ঠিক আছে। আর কখন এয়ারপোর্টে এসে নামবি জানাস। আমি তোকে আনতে যাবো।”
“হুম বন্ধু জানাবো।”
রাদিফ সাইমনের সাথে কথা বলতে বলতে উপরে চলে গেলো।
রাহা খাবার খাচ্ছে না। মূলত কোনো খাবারই তার গলা দিয়ে নামতে চাইছে না। বারবার বাড়ির সবার কথা মনে পড়ছে। মেইডটি রাহাকে খাবার খেতে না দেখে বলে উঠে,
“ম্যাম, খাচ্ছেন না যে?”
রাহা ভাবনার ঘোর থেকে বেরিয়ে বলে,
“হুম খাচ্ছি।”
রাহা খাবার মুখে তুলতে তুলতে মেইডকে বলে,
“আন্টি আমাকে প্লিজ ম্যাম বলে ডাকবেন না। আমার অসস্তি হয়। আমি আপনার থেকে অনেক ছোট। আমাকে রাহা বলে ডাকবেন!”
মেইডটি হেসে বলে,
“ঠিক আছে।”
সাইমন রাদিফের সাথে কথা বলা শেষ করে খুশি হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। সে যে জাপানে ফিরে যাচ্ছে শুধু রাহার জন্য। রাহাকে সেদিনের পর থেকে আর ভুলতেই পারছে না। রাহাকে ভালোবেসে ফেলেছে। আগে থেকেই ভালোবাসে কিন্তু কোনোদিন বলে উঠতে পারেনি বন্ধুত্ব নষ্ট হওয়ার ভয়ে। তবে এখন কেনো যেনো তার ভয় লাগছে না। এখন জাপানে ফিরে গিয়ে তার বন্ধুকে জানাবে। এরপরে যা হবার হবে।
চলবে….
এই পর্বটা দিতে দেরি হয়ে গেলো। দুঃখিত। ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। আর এই পার্টটা ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

