শর্বরে_জোনাকি ❤️,পর্ব:০১

0
131

#শর্বরে_জোনাকি ❤️,পর্ব:০১
#ইফা_আমহৃদ

বিয়ের কয়েকমাস পর যখন প্রথম বুবু বাড়িতে আসে, তখন অন্যরকম লাগছিল তাকে। প্রাণোচ্ছল বুবু আমার দিনদিন খিটখিটে, বদমেজাজি, অভিমানী, গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিল। বুবু শান্তশিষ্ট থাকলেও তার হাসিতে মাতোয়ারা ছিল পুরো গ্ৰাম, অথচ তার ঠোঁটে হাসির রেখা দেখা যেত না। সংশয় নিয়ে সেদিন প্রথমবার জিজ্ঞেস করেছিল, “বুবু, তুই হাসিস না কেন? তোকে দেখতে একদম ভালো লাগে না।”

বুবু তখন হেসে জবাব দেয়, “বিয়ে হলে সবাই এইরকম হয়ে যায়। তাদের অনেক দায়িত্ব থাকে। এ যেই-সেই দায়িত্ব না। তোর বিয়ে হলে তুইও বুঝতে পারবি, আগে বিয়ে হতে দে।”

বুবুর হাসিতে সেদিন পূর্বের মতো প্রাণোচ্ছলতা খুঁজে পেলাম না। আমি বুবু-কে জড়িয়ে ধরে গম্ভীর গলায় বলেছিলাম, “আমি তাহলে জীবনেও বিয়ে করব না।”

“কেন বিয়ে করবি না? বিয়ে করা ফরজ। একদিন না একদিন বিয়ে করতেই হবে।”

আমি নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলি, “তাহলে আমি তোর ছোট দেবর-কে বিয়ে করব। সারাদিন তোর সাথে থাকব। আমি আর তুই একসাথে সব কাজ সামলে নিবো। তাহলে তুই আগের মতো ..

আমার বাক্য শেষ হওয়ার পূর্বেই চিৎকার করে উঠে বুবু। আমি সেদিন বুঝতে পারলাম না, চিৎকারের কারণ। আমি শুধু চুপ হয়ে ছিলাম। শত জিজ্ঞাসা করেও জানতে পারিনি। তবে বাবা এই বিষয়ে সবকিছু জানতে বলে মনে হয়। বুবু ফোন করলে প্রায়ই বলতেন, মানিয়ে নে!

সেদিন বুবু যাওয়ার অনেকদিন পর আবার বাড়ি ফিরে এলো। তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন আসতে দিতে চাইতো না। আসলে পরদিন যাওয়ার জন্য ফোন দিতেন। অভিমানে তিন বছরের অধিক সময় কোনো রুপ যোগাযোগ রাখে নি। তারপরে আবার একদিন এলেন। সেদিন বিধ্বস্ত লাগছিল তাকে। শ্বশুড় বাড়ির সাথে বনিবনা না হওয়াতে ফিরে এসেছেন।
তখন আমার বয়স পনেরো পেরিয়েছে। সবকিছু বুঝতে শিখেছি। দাদাজানের প্রচুর সম্পত্তির ছিল। তিন ছেলে তার। সেই সুবাদে প্রচুর জমি পেয়েছিলেন বাবা। তবে মায়ের তিনকুলে কেউ না। মা নেই আমাদের। জ্ঞান হওয়ার পরে তাকে দেখিনি। বুবুই মায়ের ভূমিকা পালন করেছিল।‌ শুনেছি, লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মা’রা গেছেন। বুবুর ফিরে আসাতে আমি খুশি হলেও পাড়া প্রতিবেশী কটু কথা শোনাতে ছাড়ত না। পাঁচ বছরের এত অভিযোগের পর বাবা আর বুবুকে মানিয়ে নিতে বললেন না। বাড়িতে থাকার অনুমতি দিলেন। তবে আমার দুই চাচার এতে ঘোর আপত্তি। গ্ৰামে সবাই নিন্দা করবে, এই ভয়ে। আমাদের তাড়াতে পারলেই হাপ ছেড়ে বাঁচে তাঁরা। বাবার ছেলে নেই, সেই সুবাদে সমস্ত সম্পত্তি তাঁদের দখলে। দিনকাল ভালো চলছিল।
হঠাৎ একদিন বুবুর স্বামী তৌহিদ ভাই আসলেন বাড়িতে। আমি তখন উঠানে এক্কা দোক্কা খেলছিলাম। আমাকে দেখামাত্র ছুটে এলেন। দৃষ্টি ভঙ্গি বদলে বলে, “তুই পিউ না?”

“হ্যাঁ! আমি পিউ, ভাই।”

“কতবড় হয়ে গেছিস দেখছি। চেহারাও সুন্দর হয়েছে। তা কোন ক্লাসে পড়িস এখন?”

তার কথা বলার ধরন আমার পছন্দ হলো না। তবুও বললাম, “এইতো ক্লাস টেন পাশ করেছি, ইন্টারে উঠব।”

“বাহ্!”
অবিলম্বে বুবু এসে হাজির হয় সেখানে। ভাইয়াকে দেখে বেশ বিরক্ত সে। ঝাঁজালো গলায় বলে, “তোমার কাজ কী এখানে?”

“বউ এখানে, আমি কীভাবে শান্তিতে থাকতে পারি?”

“কে তোমার বউ? আমি কারো বউ না। তুমি যাতে এই বাড়িতে আসতে না পারো, সেই ব্যবস্থা খুব শীঘ্র করব।”

আমি দু’জনের কথপোকথন শুনছি। বুবু আমাকে খেয়াল করতে পারলেন। আমাকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন।
__
বড় পর্দায় খেলা চলছে বাস্কেটবল খেলা। মাটিতে বসে খেলা দেখছি আমরা। গ্ৰামের অনেকেই উপস্থিত আছেন। দশ পয়েন্টের ভেতরে স্নিগ্ধ একাই দশ পয়েন্ট করেছে। ব্রেক সময়ে চোখ টিপে দিলেন। উচ্চে পড়ল হাসি। খুশিতে উৎফুল্লিত আমি। গত দুই বছর ধরে জাতীয় দলে যোগদান করেছে, এর ভেতরেই এত ভালো খেলে। আগে তো দলের অবস্থা পুরো ঝিমিয়ে ছিল, এখন সতেজ হয়েছে। বাহ্! বেশ ভালো তো! আমার ঘরে কোণাকানায় তার ছবি লাগানো। ভুল ভ্রান্তির ছলে তাঁকে যদি স্পর্শ করা যেত, কত ভালো হতো, তাই না? ভাবতেই শরীরের লোককূপ শিউরে উঠছে। আমায় নাড়া দিয়ে মিশু বলে, “কী-রে বাড়িতে যাবি না? রাত বাড়ছে, নিরিবিলি রাত দিয়ে যাওয়ার সময় ভুত পেতে ধরলে।”

“মাত্র শুরু হলো, আরেকটু থাকি!” আদুরে আবদার আমার।

“তাহলে তুই থাক, আমি যাই। এত দেরি হওয়াতে এমনিতেই মা মা’রবে, আরও দেরি করলে জানে শেষ করে দিবে।”
আমি আর দ্বিমত পোষণ করলাম না। সায় দিলাম মিশুর কথায়। বাড়িতে যাওয়ার প্রয়াস করলাম। রাত তো কম হয়নি। নিশ্চয়ই বুবু, বাবা চিন্তা করছে। আমি রওনা হলাম বাড়ির দিকে।

“পিউ!”
ভীত হলাম আমি। পরিচিত কণ্ঠ শুনে দ্রুত পেছনে ফিরলাম। চাঁদের আলোয় রাস্তাঘাট দেখা যাচ্ছে। পেছন থেকে তীক্ষ্ণ আলো দেখা যাচ্ছে। কিছুটা নিকটে আসতে পরিচিত ঠেকল। নয়ন ভাই পেছনে পেছনে এগিয়ে আসছে। আমি চমকে গেলাম। নয়ন আমার চাচাতো ভাই। ছোটো চাচার একমাত্র ছেলে। নয়ন ভাই ঢাকায় থাকে। মাঝে মাঝে গ্ৰামে আসেন। ছোট চাচা আমাদের দেখতে পারেনা, তবে ছোটো চাচি আর নয়ন ভাই অনেক ভালো। বড় চাচার এক ছেলে, দুই মেয়ে। মিশু, মেলা আর মিহিন।
আমি খুশি হলাম‌। এই নির্জন রাস্তা দিয়ে একা যাওয়া সম্ভব নয়। আমার কাছাকাছি আসতে আমিও পায়ে গতি বাড়িয়ে দিলাম। তিনি পা মিলাতে শুরু করলেন। কিছুটা ঝাঁজালো গলায় বললেন, “এতরাতে তোর এখানে কী কাজ পিউ?”

বাবার হাত থেকে একমাত্র নয়ন ভাই বাঁচাতে পারে, তাই সত্যি বললাম, “খেলা দেখতে আসছিলাম ভাই। আমাদের বাড়িতে টিভি নাই তো, তাই দেখতে এসেছিলাম।”

“তুই যথেষ্ট বড়, এতটা অবুঝ না। গ্ৰামে এতরাতে বাড়ি যাওয়া মানায় না।
বাড়িতে বলে এসেছিস?”

মন খারাপ করে বললাম, ” বলে আসিনি, কিন্তু আমি যে বাস্কেটবল খেলা মিস্ করতে চাইনা।”

নয়ন ভাই মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “আমার একটা শর্ত আছে। যদি মানিস, তাহলে পরেরবার যখন আসব মস্ত একটা টিভি নিয়ে আসব।”

ফট করে বললাম, “কী শর্ত নয়ন ভাই?”

গম্ভীর গলায় বললেন, “আর খেলা দেখতে যাবি না। তোর বোনের কথা শুনে চলবি।”

পরক্ষণেই বললাম, “তাইলে তুমি টিভি আনবে?”

“হ্যাঁ, আনব। চল এবার..
দ্রুত পায়ে হেঁটে বাড়ির কাছে চলে এলাম। তিনতলা আমাদের বাড়ি। নিচতলায় ছোটো চাচা, দোতলায় বড় চাচা আর তিনতলায় আমরা থাকি। দাদা দাদি নেই, তাঁরা অনেক আগেই গত হয়েছেন।
বাড়ির সামনে ভিড় জমে আছে। চেনা অচেনা লোকের আনাগোনা। এতরাতে মানুষের আনাগোনার কারণ বুঝতে ব্যর্থ আমি। আমি দ্রুত নয়ন ভাইয়ের হাত চেপে ধরলাম। অশ্রুমিশ্রিত কণ্ঠে বললাম, “আমি ভেতরে যাবো না। আমাকে খুঁজে না পেয়ে বাবা নিশ্চয়ই পাড়ার লোক জড়ো করেছে।”

“আরে পা’গল ভেতরে আয়, আমি তো আছি। তোর কিচ্ছু হবেনা।”

“কিছু অন্তত করবেই, শুধু শুধু ছেড়ে দিবে না।”
নয়ন ভাই নিজের পেছনে লুকিয়ে ফেললেন আমায়। আশ্বাস দিলেন ভেতরে প্রবেশ করার। আমি পেছনে পেছনে ভেতরে ঢুকলাম। যতই সামনে এগোচ্ছি ততই ভয় বেড়েই চলেছে। বুকের ভেতরে ধুকপুকানি বাড়ছে।
সামনে সাদা কাপড়ে জড়িয়ে রাখা একজনকে দেখলাম থমকালাম। মাথা ঘুরে গেল। মাটিতে শুয়ে রয়েছে। রক্তে সাদা কাপড় টকটকে লাল হয়ে আছে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। শ্বাস নিতে পারলেও নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারছি না। কোনোমতে নিজেকে সামলে আঙুলের ইশারায় বুঝালাম, “উনি কে?”

কথা নেই। স্তব্ধ বাড়ি। অবশেষে আমি নিজেই সাদা কাপড় সরিয়ে দেখলাম। পুরো জগৎটা উল্টে গেল। আমি শুধু বুবুর মুখের দিকেই চেয়ে আছি। অজান্তেই অশ্রু ঝরল। আলতো হেসে বললাম, “বুবু, এই বুবু। কী হয়েছে তোর। টমেটো সস লাগিয়ে শুয়ে আছিস কেন? আমি তোর কথা শুনি না তাই। দেখ, উঠ। আমার এইসব একদম ভালো লাগেনা। আমি সত্যি বলছি, তোর কথার অবাধ্য হবোনা।

[চলবে.. ইন শা আল্লাহ]

একাকিত্ব, অসহায়ত্ব, দারিদ্রতা, ঝগড়া, ভালোবাসার মিশ্রনে লেখা এই গল্পটি। স্বজন হারিয়ে একটি মেয়ের বাঁচার সংগ্ৰাম নিয়ে গল্পটি। পুরোটা কাল্পনিক, বাস্তবতার সাথে মিল খুঁজতে যাবেননা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here